বৃহস্পতিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৬

বেদ এবং বুদ্ধ দর্শন আত্মা বিষয়ে

বৈদিক দর্শনের আত্মাবাদের সাথে বৌদ্ধ দর্শনের আত্মাবাদের আলোচনা
-    সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু
বি, এ (অর্নাস) এম, এ (সি, ইউ) এম, এড (ডি,ইউ)


ভূমিকা ঃ সাধারনত আত্মা বলতে দেহাতিরিক্ত কোন অজড় নিত্য দ্রব্যের ধারণা করা হয়। চৈতন্য
যার স্বাভাবিক গুণ। এই আত্মার জন্য জ্ঞাতা, কর্তা ও ভোক্তা। এই আত্মার অস্তিত্বের জন্য ব্যক্তি অভিন্নতা সুচিত হয়। ভারতীয় দর্শনে আত্মা এবং মন সমার্থক শব্দ নয়। আত্মা মন থেকে ভিন্ন এক সত্তা। মন হল অন্তরিন্দ্রিয় যার সাহায্যে আত্মা বিভিন্ন মানসিক অবস্থা গুলো প্রত্যক্ষ করে। নিম্নে বৈদিক দর্শনের ও বৌদ্ধ দর্শনের আত্মাবাদের আলোচনা করা গেল ঃ
বৈদিক দর্শন ঃ বৈদিক দর্শন বলতে আমরা বেদের সমর্থন পুষ্ঠ ষড়দর্শনকে বুঝি আর এগুলোকে আস্তিক দর্শনও বলা যায়। এগুলো হচ্ছে- ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসা, সাংখ্য, যোগ ও বেদান্ত।

ন্যায় মত ঃ নৈয়ায়িকদের মতে, আত্মা হল দ্রব্য এবং এই দ্রব্যকে আশ্রয় করে চেতনা থাকে। আত্মা হল জ্ঞাতা, কর্তা ও ভোক্তা। দেহ, ইন্দ্রিয়, মন সবগুলো আত্মা করন: যে গুলো আত্মার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আত্মা, দেহ, বাহ্য, ইন্দ্রিয় এবং মনের অতিরিক্ত এক স্বতন্ত্র সত্ত্বা। চৈতন্য আত্মার স্বাভাবিক বা অবিছেদ্য গুণ নয়। আত্মা স্বরুপতঃ অচেতন ও নিষ্ক্রিয়। আত্মা যখন মনের সঙ্গে, মন ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে এবং ইন্দ্রিয় বাহ্যুবস্তুর সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত হয়। তখন আত্মার আবির্ভাব ঘটে। নিষ্ক্রিয় বা নির্গুণ আত্মা, ভোক্তারুপে সব কিছু ভোগ করে। আত্মা স্বরুপতঃ অচেতন দ্রব্য এবং মোক্ষ অবস্থায় আত্মা নিজ স্বরুপে অবস্থান করে।

বৈশেষিক মত ঃ বৈশেষিকদের মতে, আত্মা সম্পর্কীয় নৈয়ায়িকদের ধারণা অনুরুপ। আত্মা হল এক শ্বাশত এবং সর্বব্যাপী দ্রব্য। আত্মা হল জ্ঞান বা চেতনার আশ্রয়। আত্মা  বিভূ হলেও শরীল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন। আত্মা নিত্য, আত্মার কোন বিনাশ নেই। আত্মা স্বরুপত অচেতন, কিন্তু দেহের সংস্পর্শে এসে আত্মা চেতনা লাভ করে। যেহেতু আত্মা স্বরুপতঃ নির্গুণও নিষ্ক্রিয় সে কারণে চৈতন্য আত্মার স্বাভাবিক গুন নয়, আগন্তুকও নয়।

মীমাংসক মত ঃ মীমাংসকদের মতে, আত্মা, দেহ, মন ও বুদ্ধি ভিন্ন এক স্বতন্ত্র সত্ত্বা। প্রভাকর মিশ্র ও কুমারিল ভট্ট উভয়ের মতে, আত্মা একটি দ্রব্য তবে প্রভাকরের মতে, আত্মা নিগুর্ন ও নিষ্ক্রিয়। চৈতন্য আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম নয়, কিন্তু কুমারিলের মতে, চৈতন্য আত্মার স্বাভাবিক ধর্ম। প্রভাকর মীমাংসকদের মতে, আত্মা জ্ঞাতা, সেহেতু আত্মা জ্ঞেয় হতে পারে না তবে বিষয়ের উপলদ্ধির সময় জ্ঞাতারুপে আত্মা জ্ঞাতারুপে আত্মার উপলদ্ধি ঘটে। ভট্ট মীমাংসকদের মতে, প্রতিটি বিষয়ের উপলদ্ধির সঙ্গে আত্মা জ্ঞাতারুপে প্রকাশিত হয় না। কেবলমাত্র আত্মা সচেতনার ক্ষেত্রে আত্মা বিষয় রুপে উপলদ্ধি হয়।

সাংখ্য ও যোগ মত ঃ সাংখ্য ও যোগ দর্শনমতে, আত্মা, দেহ, মন, ইন্দ্রিয় বুদ্ধি বা জড়জগতের কোন বস্তু নয়। আত্মা প্রকাশ চৈতন্য স্বরুপ। আত্মা চৈতন্য গুন বিশিষ্ট দ্রব্য নয়। চিৎ বা জ্ঞান আত্মার ধর্ম বা গুণ নয়, আত্মাই চিৎ স্বরুপ বা জ্ঞানস্বরুপ। আত্মা নিত্য, অপরিনামী, নির্গুণ ও নিষ্ক্রিয়। সাংখ্য ও যোগ দর্শন মতে, আত্মা চিত্তবৃত্তি থেকে স্বতন্ত্র এক আধ্যাত্মিক।
বেদান্ত মত ঃ অদ্বৈতবেদান্ত মতে, আত্মা বিশুদ্ধ চৈতন্য স্বরুপ, নিরবয়ব বা নিরংশ। আত্মা নির্বিশেষ, নিত্য, অখন্ড, আদি ও অন্তহীন, আত্মার বহুত্ব সম্ভব নয়। ব্যবহারিক দৃষ্টিতে আত্মা বহু, কিন্তু পরমার্থ দৃষ্টিতে আত্মা এক। পরমাত্মাই ব্রহ্ম। এক ব্রহ্ম মায়া প্রভাবে নানা উপাধিযুক্ত হয়ে জীবত্মারুপে প্রতিভাত হয়।

বৌদ্ধ দর্শন ঃ বৌদ্ধ দর্শন মতে, আত্মা অভিজ্ঞতাবাদী বৌদ্ধ দার্শনিকগণও কোন শ্বাশত বা চিরন্তন আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করে না। কোন এক মহুর্তে আমাদের মধ্যে আমরা যে সব মানসিক প্রক্রিয়া গুলো দেখি সে সব মানসিক অন্তরালে কোন শাশ্বত বা চিরন্তন সত্তার আস্তিত্ব নেই। মানুষের মধ্যে কোন অপরিবর্তনীয় সত্তার অস্তিত্ব না থাকলেও মানুষের জীবনের বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা আছে, তার দ্বারা ব্যক্তি অভিন্নতা ব্যাখ্যা করা চলে। শ্বাশত আত্মার স্বীকার না করেও বুদ্ধ জন্মান্তর অর্থে কোন চিরন্তন অর্থে বর্তমান জীবন থেকে পরবর্তী জীবনের উদ্ভব। জীব হল মানসিক প্রক্রিয়ার প্রবাহ। এই মানসিক প্রক্রিয়া এক জন্ম থেকে আর এক জন্মে প্রবাহিত হয়। মানুষ পঞ্চস্কন্ধের সৃষ্টি এই পঞ্চস্কন্ধ হল- রুপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার এবং বিজ্ঞান।

বুদ্ধমতে, যারা শ্বাশত অখন্ড আত্মার কথা বলেন তারা মূলতঃ পঞ্চস্কন্ধকে একত্রে বা কোন একটিকে প্রত্যক্ষ করে শ্বাশত আত্মার কথা বলে থাকেন।

আত্মা সম্পর্কে ভারতীয় দর্শন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মতামতের সমালোচনায় বলা যায়, নৈয়ায়িক ও বৈশেষিকদের আত্মা সম্পর্কীয় ধারণা সন্তোষ জনক নয়। তাদের মতে আত্মা, স্বরুপতঃ অচেতন এবং নির্গুণ, কিন্তু এই ধারণা যুক্তিযুক্ত নয়। কেননা আত্মা যদি স্বরুপতঃ অচেতন হয় তাহলে আত্মার সঙ্গে জড়বস্তুর পার

আত্মা এবং ধর্ম

আত্মা ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনের একটি মৌলিক ধারণা। আত্মার ধারণা সম্পর্কে প্রাচ্য ও প্রতীচ্য ভাবধারায় দুটি বিপরীতধর্মী মতামত রয়েছে। আত্মাকে সাধারণত একটি স্থায়ী আধ্যাত্মিক সত্তা মনে করা হয়। এই সত্তা দেহকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকে ও মৃত্যুবরণ করে এবং মৃত্যুর পর অন্য দেহে অবস্তান্তর প্রাপ্তি হয়। আস্তিক নামে পরিচিত ছয়টি ভারতীয় দার্শনিক সম্প্রদায় এই ধারণা পোষণ করে। ঋক বেদের স্তোত্রে এক ঈশ্বরের উল্লেখ রয়েছে যিনি পরমসত্তা এবং বিশ্বের অন্য সকল দেবতা ও বস্ত্তর সৃষ্টিকর্তা বা উৎস। উপনিষদে এই পরমসত্তাকে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়: আত্মা, ব্রহ্ম, সৎ (অস্তিত্বশীল সত্তা) ইত্যাদি। আত্রেয় ও বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে যে, সর্বপ্রথম শুধু আত্মারই অস্তিত্ব ছিল এবং ছান্দোগ্য উপনিষদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আত্মাকে জানলেই সবকিছু জানা হয়ে যায়। ছান্দোগ্য উপনিষদে অনুরূপ ধারণা লক্ষ করা যয়। এখানে বলা হয়েছে, ‘শুরুতে শুধু একটি সত্তাই ছিলেন, তিনি এক ছিলেন এবং তাঁর কোনো দ্বিতীয় ছিল না।’ বিশ্বতাত্ত্বিক নীতি হিসেবে আত্মা হচ্ছে ‘শাশ্বত আত্মা’ বা ‘শাশ্বত বিদেহী আত্মা’ যা ব্রক্ষের সমার্থক। বৃহদারণ্যক উপনিষদের বিভিন্ন উক্তি, যেমন, ‘এই আত্মাই হচ্ছে ব্রহ্ম’ বা ‘আমিই ব্রহ্ম’, থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, আত্মা ও ব্রহ্ম এক ও অনুরূপ। ব্রহ্ম ‘দ্বিতীয়হীন’। তিনি শুধু এই বিশ্বের নীতি বা স্রষ্টা নন, তিনি বরং প্রতিটি জীবনের মধ্যে পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান।

শংকরের অদ্বৈতবাদের (একত্ববাদ) মতো বেদান্ত দার্শনিক সম্প্রদায় আত্মা ও ঈশ্বরের অভিন্নতা সম্পর্কিত উপনিষদের মতবাদ স্বীকার করেন এবং তাঁদের মতে প্রতিটি জীবন্তসত্তা ও ব্রহ্ম সম্পূর্ণ অভিন্ন এবং আত্মা সব জগতে পরিব্যাপ্ত। রামানুজের দ্বৈতাদ্বৈতবাদের (দ্বৈতবাদ) মতো অন্য একটি বেদান্ত দার্শনিক সম্প্রদায় শংকরের অদ্বৈতবাদী মতবাদের সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করে। তাঁদের মতে, প্রতিটি জীবন্তসত্তার আত্মা ও পরমসত্তা বা পরমাত্মা ভিন্ন। শংকরের অদ্বৈতবাদ হচ্ছে বিশুদ্ধ নির্গুণ একত্ববাদ, কারণ তিনি এক ঈশ্বর ভিন্ন অন্য কিছু স্বীকার করেন না, বরং ঈশ্বরের মধ্যে সকল প্রকার বহুত্ব অস্বীকার করেন। সুতরাং, তাঁর মতে জগৎ প্রকৃত সৃষ্টি নয়, অবভাস মাত্র। ঈশ্বর তাঁর মায়ারূপ শক্তি দিয়ে এই জগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং আমাদের অবিদ্যার কারণেই এই জগৎ প্রকৃত জগৎ বলে মনে হয়। রামানুজ ও শংকরের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন যে, ঈশ্বর হচ্ছে পরমসত্তা, কিন্তু তিনি এই কথা অস্বীকার করেন যে, ঈশ্বর ভিন্ন আর কিছু নেই। রামানুজ বহুত্বে বিশ্বাস করেন, কারণ ঈশ্বরের দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ রয়েছে: জড়বস্ত্ত ও সসীম আত্মা। রামানুজের দ্বৈতাদ্বৈতবাদকে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ বলা হয়, কারণ ব্রহ্মের ঐক্যের (অদ্বৈতের) চেতনা ও অচেতন নামক দুটি অংশ রয়েছে। সুতরাং, রামানুজের মতে, শংকর যাকে মায়া বলেছেন, জগৎ সে রকম মায়া নয়, জগৎ ঈশ্বরের (ব্রহ্মের) অবিচ্ছেদ্য অংশ। যদিও প্রতিটি আত্মার একটি শারীরিক রূপ আছে, তথাপি আত্মা এই বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে। মুক্ত আত্মা ঈশ্বরের অনুরূপই হয়, তাঁর সঙ্গে অভিন্ন হয় না।

সাংখ্য, ন্যায় বৈশেষিক, যোগ ও মীমাংসার মতো অন্যান্য আস্তিক সম্প্রদায় ও বেদান্ত দার্শনিকদের মতো দেহ-মন থেকে স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবে আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে। সাংখ্য দর্শনে আত্মাকে দ্বিতীয় সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই দ্বিতীয় সত্তা পুরুষ নামে পরচিত, আর অন্য সত্তাটি হচ্ছে প্রকৃতি। জগতের বিবর্তনে আত্মা (পুরুষ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ পুরুষ ও প্রকৃতির মিলনের ফলেই আত্মা বিবর্তিত হতে শুরু করে। সাংখ্যদর্শনে আত্মার অস্তিত্ব স্ব-প্রকাশিত, কারণ প্রত্যেকেই তার স্ব-স্ব অস্তিত্ব অনুভব করে। বেদান্তের অদ্বৈতবাদ যেখানে সকল জীবনসত্তায় পরিব্যাপ্ত এক শাশ্বত আত্মার কথা স্বীকার করে সেখানে সাংখ্য প্রতিটি জীবসত্তার সঙ্গে সংযুক্ত বহু আত্মার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে।

ন্যায়-বৈশেষিক ও মীমাংসা দর্শন আত্মাকে অবিনশ্বর, শাশ্বত ও অসীম হিসেবে বর্ণনা করে, কারণ আত্মা দেশকালে সীমাবদ্ধ নয়। দেহ, ইন্দ্রিয় ও মন থেকে একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে আত্মা জ্ঞান, অনুভূতি ও কর্চেছার মতো গুণের অধিকারী। উপনিষদে আত্মাকে অসীম চেতনা হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। অবশ্য ন্যায়-বৈশেষিক ও মীমাংসা দর্শনে চেতনা আত্মার আবশ্যিক ও অবিচ্ছেদ্য গুণ নয়। দেহের সঙ্গে যুক্ত হলেই আত্মাকে সকল চেতনা অবস্থা ও জ্ঞানের আবির্ভাব ঘটে। অবশ্য আত্মা সর্ব পরিব্যাপ্ত নয় বলে সকল জীবনদেহে পাওয়া যায় না। বিভিন্ন দেহের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আত্মা রয়েছে। দেহ প্রাপ্তি হলেই আত্মায় চেতনা জাগ্রত হয়, তার দেহের বিনাশ সাধনে আত্মা সম্পূর্ণরূপে জ্ঞান ও চেতনামুক্ত হয়।

যোগদর্শন অনুসারে স্থূল ও সূক্ষ্মশরীরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকলেও আত্মা (জীব) একটি মুক্ত সত্তা।

বুদ্ধ চিন্তা

গৌতম বুদ্ধ ছিলেন প্রাচীন ভারতের এক ধর্মগুরু এবং তাঁর দ্বারা প্রচারিত ধর্ম বিশ্বাস ও জীবন দর্শনকে বৌদ্ধ ধর্ম বলা হয়। খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দিতে গৌতম বুদ্ধের জন্ম। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অনুগামীরা তাঁর জীবনকথা ও শিক্ষা লিপিবদ্ধ করেন। তাঁর শিক্ষাগুলি প্রথম দিকে মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। বুদ্ধের মৃত্যুর প্রায় চারশো বছর পর এগুলি লিপিবদ্ধ করা হয়।
গৌতম বুদ্ধের পিতা ছিলেন রাজা শুদ্ধোদন আর মাতা ছিলেন মায়াদেবী। মায়াদেবী কপিলাবস্তু থেকে পিতার রাজ্যে যাবার পথে অধুনা নেপালের অন্তর্গত লুম্বিনি গ্রামে বুদ্ধের জন্ম দেন। তাঁর জন্মের সপ্তম দিনে মায়াদেবীর জীবনাবসান হয়। পরে তিনি বিমাতা গৌতমী কর্তৃক লালিত হন। জন্মের পঞ্চম দিনে রাজা ৮ জন জ্ঞানী ব্যক্তিকে সদ্যোজাত শিশুর নামকরণ ও ভবিষ্যৎ বলার জন্য ডাকেন। তাঁর নাম দেওয়া হয় সিদ্ধার্থ – যে সিদ্ধিলাভ করেছে বা যার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন বলেন, রাজকুমার একদিন সত্যের সন্ধানে বেরিয়ে যাবেন এবং বোধিপ্রাপ্ত হবেন।
বুদ্ধের বিবাহ সম্বন্ধে দুই ধরণের মত আছে। প্রথম মত অনুসারে ১৬ বছর বয়সে তিনি একটি প্রতিযোগিতায় তাঁর স্ত্রীকে লাভ করেন। আর একটি মত অনুসারে ২৮ বছর বয়সে তাঁকে সংসারের প্রতি মনোযোগী করার জন্য তাঁর পিতা-মাতা তাঁকে রাজকন্যা যশোধরার সাথে বিবাহ দেন।
কথিত আছে, একদিন রাজকুমার সিদ্ধার্থ বেড়াতে বের হলে ৪ জন ব্যক্তির সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। প্রথমে তিনি একজন বৃদ্ধ মানুষ, অতঃপর একজন অসুস্থ মানুষ, এবং শেষে একজন মৃত মানুষকে দেখতে পান। তিনি তাঁর সহিস চন্নকে এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলে চন্ন তাঁকে বুঝিয়ে বলেন যে, এটিই সকল মানুষের নিয়তি। একই দিন কিংবা অন্য একদিন তিনি দেখা পেলেন একজন সাধুর, যিনি মুণ্ডিতমস্তক এবং পীতবর্ণের জীর্ণ বাস পরিহিত। চন্নকে এঁর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে, তিনি বলেন উনি একজন সন্ন্যাসী যিনি নিজ জীবন ত্যাগ করেছেন মানুষের দুঃখের জন্য। রাজকুমার সিদ্ধার্থ সেই রাত্রেই ঘুমন্ত স্ত্রী, পুত্র, ও পরিবারকে নিঃশব্দ বিদায় জানিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করেন। সিদ্ধার্থের এই যাত্রাকেই বলা হয় মহানিষ্ক্রমণ।
তার মানে মানুষের বৃদ্ধ হওয়া, অসুস্থ হওয়া, মৃত্যু হওয়া, ও সন্ন্যাসীদের সম্বন্ধে বুদ্ধের কোনো ধারণা ছিল না। তিনি এগুলো জানতে পেরেছেন চন্ন নামের এক ব্যক্তি থেকে। এই অবস্থায় তিনি ঘুমন্ত স্ত্রী, পুত্র, ও পরিবারকে নিঃশব্দ বিদায় জানিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করেন।
দুঃখ ও দুঃখের কারণ সম্বন্ধে জানতে সিদ্ধার্থ যাত্রা অব্যাহত রাখেন। প্রথমে তিনি আলারা নামক একজন সন্ন্যাসীর কাছে যান। তাঁর উত্তরে সন্তুষ্ট হতে না পেরে তিনি যান উদ্দক নামক আর একজনের কাছে। কিন্তু এখানেও কোনো ফল না পেয়ে কিছু দিন যাবার পর তিনি মগধের উরুবিল্ব নামক স্থানে গমন করেন। সেখানে প্রথমে একটি উত্তর-পূর্বমুখি শিলাখণ্ডের উপর বোধিসত্ত্ব জানু পেতে বসে আপন মনেই বলেছিলেন যে, "যদি আমাকে বুদ্ধত্বলাভ করতে হয় তা হলে বুদ্ধের একটি প্রতিচ্ছায়া আমার সম্মুখে দৃশ্যমান হোক।" এই কথা উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে শিলাখণ্ডের গায়ে তিন ফিট উঁচু একটি বুদ্ধের প্রতিচ্ছায়া প্রতিফলিত হয়। বোধিসত্ত্ব তপস্যায় বসার পূর্বে দৈববাণী হয় যে, "বুদ্ধত্ব লাভ করতে গেলে এখানে বসলে চলবে না; এখান থেকে অর্ধযোজন দূরে পত্রবৃক্ষতলে তপস্যায় বসতে হবে।" এরপর দেবগণ বোধিসত্ত্বকে সঙ্গে করে এগিয়ে নিয়ে যান। মধ্যপথে একজন দেবতা ভূমি থেকে একগাছা কুশ ছিঁড়ে নিয়ে বোধিসত্ত্বকে দিয়ে বলেন যে, এই কুশই সফলতার নিদর্শন স্বরূপ। বোধিসত্ত্ব কুশগ্রহণের পর প্রায় পাঁচ শত হাত অগ্রসর হন এবং পত্রবৃক্ষতলে ভূমিতে কুশগাছটি রেখে পূর্বমুখি হয়ে তপস্যায় বসলেন। কঠোর সাধনার ফলে তাঁর শরীর ক্ষয়ে যায়। কিন্তু এ তপস্যায় তিনি ভয়, লোভ, ও লালসাকে অতিক্রম করে নিজের মনের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে সক্ষম হলেন। সহসা তিনি বুঝতে পারেন এভাবে বোধিলাভ হবে না। তিনি তাই আবার খাদ্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন। অবশেষে কঠোর তপস্যার পর তিনি বুদ্ধত্বপ্রাপ্ত হলেন। তিনি দুঃখ, দুঃখের কারণ, প্রতিকার প্রভৃতি সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করলেন। এ ঘটনাটিই বোধিলাভ নামে পরিচিত। আক্ষরিক অর্থে "বুদ্ধ" বলতে একজন জ্ঞানপ্রাপ্ত মানুষকে বুঝায়। উপাসনার মাধ্যমে উদ্ভাসিত আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং পরম জ্ঞানকে "বোধি" বলা হয়।
বুদ্ধের দর্শনের প্রধান অংশ হচ্ছে দুঃখের কারণ ও তা নিরসনের উপায়। বাসনা সর্ব দুঃখের মূল। বৌদ্ধমতে সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্তিই হচ্ছে প্রধান লক্ষ্য। এটাকে নির্বাণ বলা হয়। নির্বাণ শব্দের আক্ষরিক অর্থ নিভে যাওয়া, বিলুপ্তি, বিলয়, অবসান, ইত্যাদি। এ সম্বন্ধে বুদ্ধের চারটি উপদেশ (Four Noble Truths) যা আর্যসত্য বা চতুরার্য সত্য নামে পরিচিত:
1. Suffering does exist
2. Suffering arises from attachment to desires
3. Suffering ceases when attachment to desire ceases
4. Fre

বুদ্ধ দর্শন

প্রাপ্তিস্থান : ট্যাং ডাইন্যাষ্টি, চায়না। সময়কাল : ৬১৮ - ৯০৭ সাল
ছবি : আর্ট ইন্স্টিটিউট অব শিকাগো থেকে সংগৃহীত।
ধর্মপ্রচার নয়, বিভিন্ন ধর্মমত সম্পর্কে যৎসামান্য জানার প্রচেষ্টা মাত্র
গৌতম বুদ্ধের জন্ম ও সময়কাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। কারও কারও মতে বুদ্ধের সময়কাল ৫৬৩ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ হতে ৪৮৩ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দ।
বুদ্ধের পিতৃদত্ত নাম সিদ্ধার্থ, সম্ভবত তাঁর গোত্রনাম গৌতম অথবা তাঁর পালিকা বিমাতা গৌতমীর নাম থেকেই গৌতম নামের উদ্ভব।
তাঁর পিতা ছিলেন শাক্যবংশীয় রাজা শুদ্ধোধন, মাতা মায়াদেবী।
বুদ্ধের জন্মস্থান : কপিলাবস্তুর সন্নিকটে লুম্বিনি নামক স্থানে (অধুনা নেপাল)।
কথিত আছে, মায়াদেবী পিতৃগৃহে যাবার সময় লুম্বিনি গ্রামের একটি বাগানে সিদ্ধার্থের জন্ম দেন। সিদ্ধার্থের জন্মের সাতদিন পরে মায়াদেবীর মৃত্যু হয় এবং সিদ্ধার্থ তাঁর বিমাতা গৌতমীর নিকট প্রতিপালিত হন।
সিদ্ধার্থের স্ত্রীর নাম ছিল যশোধরা, মতান্তরে যশোধা বা গোপা এবং পুত্রের নাম ছিল রাহুল।
কথিত আছে, সিদ্ধার্থ একদিন তাঁর সহিস চন্নের (মতান্তরে ছন্দক) সাথে ঘুরতে বেরিয়ে একজন জরাগ্রস্থ বৃদ্ধকে দেখলেন, একজন রোগগ্রস্থ দুর্বল ব্যক্তিকে দেখলেন এবং একটি শবযাত্রা দেখলেন যার অনুগামীগণ বিলাপরত ছিলেন। তিনি বিষয়গুলি সম্পর্কে চন্নের কাছে জানতে চাইলেন। চন্ন তাঁকে জানালেন এটাই স্বাভাবিক জীবন ধর্ম। আরেকদিন চন্নের সাথে বেরিয়ে তিনি পীতবস্ত্র পরিহিত একজন প্রসন্নচিত্ত সন্ন্যাসীকে দেখলেন। তাঁর সম্পর্কে জানতে চাইলে চন্ন জানালেন, এই সন্ন্যাসীটি মানব কল্যানের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
এবিষয়গুলো সিদ্ধার্থের অন্তর ছুঁয়ে যায়। দুঃখ, জরা, মৃত্যু ইত্যাদি বিষয়গুলো তাকে ভাবিত করে তোলে।
ঊনত্রিশ বছর বয়সে তিনি বিবাগী হয়ে সংসার ত্যাগ করেন। প্রথমে তিনি আরাল কালাম (মতান্তরে আলারা) নামক একজন শাস্ত্র বিশেষজ্ঞের কাছে যান, সেখানে তিনি সন্তোষজনক উত্তর না পেয়ে উদ্দক নামক আরেক পন্ডিতের কাছে যান। তাঁর কাছেও তিনি মনপুত উত্তর না পেয়ে সঠিক জ্ঞান লাভের নিমিত্ত বৌদ্ধগয়ায় পর্যায়ক্রমে ছয় বৎসরকাল কঠোর তপস্যার মাধ্যমে বোধিজ্ঞান লাভ করেন।
সিদ্ধার্থ তপস্যাকালে অনাহারের কারণে অত্যন্ত কৃশ হয়ে পড়েছিলেন। সে সময়ে তিনি অনশন ভঙ্গ করে সুজাতা নাম্নী এক নারীর কাছ থেকে এক পাত্র পরমান্ন আহার করেছিলেন। অতঃপর তিনি নদীতে স্নান করে পুনরায় ধ্যানরত হন। সে কারণে যে পাঁচ জন তপস্যাসঙ্গী মনঃক্ষুন্ন হয়ে সিদ্ধার্থকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, ছত্রিশ বছর বয়সে বোধিজ্ঞান লাভ করার পর তিনি ঋষিপত্তন মৃগদাবে সর্বপ্রথম তাঁর দর্শন প্রচার করেন সেই পাঁচ জন ভিক্ষুর মাঝে। যাঁরা ছিলেন, বুদ্ধের প্রথম শিষ্যত্ব গ্রহনকারী পঞ্চ বর্গীয় শিষ্য। তাঁরা হলেন, কৌন্ডিন্য, বপ্প, ভদ্দিয়, মহানাম এবং অশ্বজিৎ। পরবর্তিতে তিনি আরও অনেককে দীক্ষাদান করেন।
ইতিহাস পর্যালোচনায় পাওয়া যায় ৪৯০ খ্রীষ্ট পূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে কোশলরাজ প্রসেনজিতের পাটরানী মল্লিকাদেবী বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। মল্লিকাদেবীর প্রিয় সখী বিশাখা বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন স্বরূপ সহস্র প্রকোষ্ঠের একটি সাততলা বিশাল বিহার 'পূর্বারাম মৃগার মাতা প্রাসাদ' বুদ্ধদেবকে দান করেছিলেন (রাহুল সাংকৃত্যায়ন, ভোলগা থেকে গঙ্গা)।
এ সময়ে জৈবলী, উদ্দালক এবং যাজ্ঞবল্ক্য প্রভৃতি ঋষিগণ ব্রহ্মবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁদের মতবাদ প্রচার করছিলেন।
সমসাময়িক কালে 'অজিত কেশকম্বল' নামে এক গৃহত্যাগী ব্রহ্মচারী যিনি ছিলেন একেবারেই জড়বাদী, তিনি ভৌতিক (জড়) পদার্থ ছাড়া আত্মা, ঈশ্বরভক্তি, নিত্য-তত্ত্ব অথবা স্বর্গ-নরক-পুনর্জন্মবাদ মানতেন না।
তিনি বলতেন, 'আত্মা, ঈশ্বর ইত্যাদি নিত্য বস্তু পৃথিবীতে নেই। সর্ব বস্তুই উৎপন্ন হয় এবং অচিরেই বিলীন হয়ে যায়। সংসার কতগুলি বস্তুর প্রবাহ নয়, বরং ঘটনাবলীর স্রোত।' তাঁর প্রচারিত মতবাদ জ্ঞানীরা খুবই যুক্তিসঙ্গত ও হৃদয়গ্রাহী মনে করতেন। কিন্ত ঐ অনাদিবাদে লোক-মর্যাদা, ধনী-গরীব, দাস-স্বামীর প্রভেদ নষ্ট হয়, তাই অজিতের জড়বাদ সামন্ত ও ব্যবসায়ীদের প্রিয় হতে পারলোনা (রাহুল সাংকৃত্যায়ন, ভোলগা থেকে গঙ্গা)।
গৌতম বুদ্ধ নিজের অনাত্মবাদ ও জড়বাদের মধ্যে আরও কিছু যোগ করে তার তিক্ততা কিছুটা দূর করলেন। তাঁর মতে আত্মা নিত্য না হলেও চেতনা-প্রবাহ স্বর্গ কিম্বা নরকের মানুষের মধ্যে এক দেহ হতে আরেক দেহে--- এক শরীর-প্রবাহ হতে আরেক শরীর-প্রবাহে সঞ্চারিত হয় (রাহুল সাংকৃত্যায়ন, ভোলগা থেকে গঙ্গা)। তৎকালে কোশলের নগরবধু আম্রপালী বুদ্ধের কাছে দীক্ষা নিয়ে ভিক্ষুণী হয়েছিলেন। তিনি তাঁর বিশাল প্রাসাদ সঙ্ঘকে দান করেছিলেন। তিনি ভিক্ষুণীসঙ্ঘের প্রধানাও হয়েছিলেন।
বৌদ্ধমতে দীক্ষা নিতে ত্রিশরণ মন্ত্রোচ্চারণ করতে হয়।
(১) বুদ্ধং শরণম গচ্ছামি ( আমি বুদ্ধের শরণ নিলাম)।
(২) ধম্মং শরণম গচ্ছামি ( আমি ধর্মের শরণ নিলাম)।
(৩) সঙ্ঘং শরণম গচ্ছামি ( আমি সঙ্ঘের শরণ নিলাম)।

আত্মা কি?

ভারতীয় সভ্যতার অতীত দুটি ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। এর ভবিষ্যতও দুটি ধারণার পুনর্ব্যাখ্যা ও পুনরুৎপাদনের উপর নির্ভর করবে। তা হলো, আত্মা ও ব্রহ্ম। ভারতীয় দর্শন ও ভাবজগতের মূল শেকড় এ দুটি ধারণার ভেতর প্রোথিত। বহুমাত্রিক উৎকর্ষের বাস্তবিক ঐক্যের প্রতীক ভারতীয় সভ্যতা। সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনে রাজা যায় রাজা আসে। কিন্তু ভারতীয় দর্শনের সৌধ, আত্মিক আকাঙ্ক্ষার মিনার উচ্চ থেকে উচ্চতর গগণ চুমেছে।

অতি প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ভারতীয় চিন্তার বিশয়-আশয় তেমন পরিবর্তিত হয়নি। যদিও ষড় দার্শনিক শ্রেণী, ধর্মগুরু ও ভাবুক-ঋষীদের স্থানিক ও কালিক ব্যাখ্যা নিয়ে ইহজগৎ ও পরজগতের ভেদ-অভেদ সম্পর্কে নতুন নতুন বয়ান তৈরি হয়েছে। তবু অসম্ভব বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রকৃতিজগত ও চিন্তা বলয়ে আধ্যাত্মিক ও বস্তুজগতের প্রমিত এবং মীমাংসিত কোনো ব্যাখ্যা নাই।

মীমাংসিত দর্শনের অভাব আমাদের মূর্খ ‘ভাবের’ স্বভাব কিনা এই সন্দেহের অবতারণা করেই বলা যায়, চরম ভোগবাদী ও বস্তুবাদী আধুনিক প্রজন্মের জীবন জিজ্ঞাসা পরিশেষে এই দুই মূলের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে। কারণ চরম ভোগবাদিতা ও বস্তুবাদী মানসিকতা থেকে বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং হতাশা জন্ম নেয়। এছাড়া বস্তুর শেষ সীমা হলো অবস্তু। এমনকি বস্তুর গভীরতর অন্বেষা অবস্তুর ইঙ্গিত দেয়।

বর্তমান পদার্থ বিজ্ঞানেরও মূলকথা এই যে, পদার্থ মানে শুধু বস্তু নয়, অবস্তুগত চেতনা, শক্তি এবং বস্তুর ধর্মও পদার্থের মৌলিক অংশ। এ কারণেই বস্তুর সামগ্রিক অনুধাবন সরল বস্তুবাদের অসারতা এবং ভোগবাদীতার সমাপ্তির কথা জানান দেয়।

মানুষের সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ কিছু মৌলিক দার্শনিক অবস্থান থেকে উৎসারিত হয়। তাই যুগ যুগান্তরের পরম্পরায় ভারতীয় মানুষের জীবনাচার, জীবন-জগতের মূল্যায়ন, পুরো মহাজগতের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বিচারসহ জীবন সম্পৃক্ত হাজারো প্রশ্ন দার্শনিক বাহাস আকারে পুনঃমূল্যায়নের প্রয়োজন পড়ে। ভারতীয় সভ্যতার ধর্মভাব, নীতি-মূল্যবোধের মূল ভিত্তি হল দর্শন।

দর্শনের আওতায় ধর্মভাব অথবা ধর্মীয় পদ-পদার্থের দার্শনিক ভেদ বিচার পুরাতন রেওয়াজেরই নতুন আবৃত্তি। এক্ষেত্রে আত্মা ও ব্রহ্ম সম্পর্কিত প্রচলিত মত-মতান্তরের প্রতি অঞ্জলি দিয়ে সমকালীন ভাবধারা সনাক্ত করার প্রয়াস চালাচ্ছি।

এক সময় বিশাল প্রকৃতি জগতে মানুষ নিজেকে নিঃসঙ্গ ও অসহায় পেয়ে আধ্যাত্মিক অন্বেষায় প্রবৃত্ত হয়েছে। আধুনিক যুগেও অজস্র ভিড়ের মাঝে প্রত্যেকে নিঃসঙ্গ এবং কিংকর্তব্যবিমুঢ়। এই আধুনিক নিঃসঙ্গ বিমুঢ়তা থেকে মুক্তির পথও এই ভোগে নয়, অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। এ আওয়াজ আসতে শুরু করেছে। কারণ সমাজে এখন এক ধরণের আধ্যাত্মিক অশান্তি বিরাজ করছে। আর আধ্যাত্মিক অশান্তি থেকেই দর্শনের উৎপত্তি ঘটে।

আধ্যাত্মিক অশান্তি মানে অসন্তুষ্টি। মানুষ বস্তুগত চটুল জ্ঞানের পরিধি পেরিয়ে যখন অবস্তুগত চেতনার দিকে অনুসন্ধিৎসু মনকে প্রবিষ্ট করে তখন চেতনা ছাড়া আর কিছুই পায় না। কিন্তু চেতনা ভাষাহীন বা ভাষাতীত। এই ভাষাতীত জিনিসকে আয়ত্ত্ব করতে চাই যৌক্তিক কাঠামো ও সূত্রায়ন, যা বোধগম্য ভাষায় রূপান্তরযোগ্য। এই ভাষাতীত চেতনাকে যৌক্তিক ভাষায় সূত্রবদ্ধ করলে যা দাঁড়ায় তা হল দর্শন। আর এই ভাষিক সূত্রকে অণু-পরমাণু কিংবা বস্তুর কাঠামোতে স্থাপনযোগ্য করে বস্তুগত উৎপাদনের আওতায় আনতে পারলে যা হয় তার নাম বিজ্ঞান। মূর্ত জীবন ভাবনার বিমূর্ত স্তর হল দর্শন আর বিমূর্ত ভাবের মূর্ত অবয়ব হল বিজ্ঞান ও বাস্তবতা। তাই সাধারণ মানুষের সরল জীবন ভাবনার বিভ্রান্তিকে বিশুদ্ধ করতে দর্শন আর দেশ-কালের দাহনে অতৃপ্ত জীবন বোধে তৃপ্তি আনতে আধ্যাত্মিকতার কাছেই মানুষ বার বার প্রত্যাবর্তন করে।

যদিও ভারতীয়দের বিশ্বাস কোনো মানুষ বেদ রচনা করেনি, বেদ স্বয়ং ব্রহ্মের বাণী। ধারণা করা হয়ে থাকে ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বে বেদ রচিত হয়েছিল। পরে ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বে উপনিষদ রচিত হয় যেখানে প্রথম বেদের দার্শনিক সংশ্লেষ পাওয়া যায়। বেদের কর্তৃত্ব স্বীকার করে এমন দার্শনিক ঘরানাকে ছয় ভাগে ভাগ করা হয়েছে যারা আস্তিক বলে বিবেচিত এবং ছয়টি দার্শনিক ঘারানা ষড় দর্শন হিসেবে পরিচিত। এই আস্তিক ষড় দর্শন হল- সাংখ্য, যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক, মীমাংসা ও বেদান্ত দর্শন। শাস্ত্র হিসেবে বেদের প্রাধান্য স্বীকার করে না এ রকম নাস্তিক ঘারানার দর্শন হল- চার্বাক, বৌদ্ধ ও জৈন দর্শন।

জড়বাদী চার্বাক দার্শনিকদের মতে দেহাতিরিক্ত অজড় কোনো আত্মা নাই। চৈতন্যবিশিষ্ট দেহই আত্মা। ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে কোনো অবস্তুগত চেতন আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না। তাই আত্মাও নাই। কিন্তু জৈনরা বেদের শাস্ত্রিক প্রাধান্য স্বীকার না করলেও পুরোপুরি বস্তুবাদী নয়। তারা একটি দেহাতিরিক্ত সত্ত্বা হিসেবে আত্মার অস্থিত্ব স্বীকার করে। তাদের মতে আত্মা সচেতন, সগুণ, নিত্য ও সক্রিয় দ্রব্য। দ্রব্